USG টেস্ট কী: আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা
আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন আপনারা? শরীরটা ঠিকঠাক আছে তো? আজকের ব্লগ পোস্টে আমরা USG (আলট্রাসাউন্ড) পরীক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। USG টেস্ট কী, কেন করা হয়, কীভাবে করা হয় এবং এর সুবিধা-অসুবিধাগুলো কী কী – সবকিছু সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলব। তাহলে চলুন, শুরু করা যাক!
USG টেস্ট কী: আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা
USG, যার পুরো নাম আলট্রাসনোগ্রাফি (Ultrasonography), হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর ছবি তৈরি করা হয়। এটি একটি নিরাপদ এবং ব্যথামুক্ত পরীক্ষা। গর্ভাবস্থায় বাচ্চা কেমন আছে, তা জানার জন্য এই পরীক্ষা বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়। শুধু গর্ভবতী মহিলাই নন, নারী-পুরুষ উভয়েরই বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের জন্য USG করা হয়ে থাকে।
USG (আলট্রাসনোগ্রাফি) কেন করা হয়?
USG বিভিন্ন কারণে করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
- গর্ভাবস্থা: গর্ভাবস্থায় বাচ্চার বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য নিরীক্ষণের জন্য USG একটি অপরিহার্য পরীক্ষা।
- পেটের সমস্যা: পেটে ব্যথা, গ্যাস, বা অন্য কোনো সমস্যা হলে USG-এর মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা যায়।
- কিডনির সমস্যা: কিডনিতে পাথর বা অন্য কোনো সমস্যা আছে কিনা, তা জানতে USG করা হয়।
- লিভারের সমস্যা: লিভারের আকার, গঠন এবং কোনো টিউমার আছে কিনা, তা দেখার জন্য USG করা হয়।
- গলব্লাডারের সমস্যা: গলব্লাডারে পাথর বা প্রদাহের কারণে USG করার প্রয়োজন হতে পারে।
- থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা: থাইরয়েড গ্রন্থির আকার এবং কোনো নডিউল (Nodule) আছে কিনা, তা জানার জন্য USG করা হয়।
USG কত প্রকার ও কী কী?
আলট্রাসনোগ্রাফি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, যা শরীরের বিভিন্ন অংশের পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়। নিচে কয়েকটি প্রধান প্রকার উল্লেখ করা হলো:
অ্যাবডোমিনাল আলট্রাসনোগ্রাফি (Abdominal Ultrasonography)
এই পরীক্ষায় পেটের ভেতরের অঙ্গ যেমন – লিভার, কিডনি, গলব্লাডার, প্লীহা এবং অগ্ন্যাশয় পরীক্ষা করা হয়। পেটে ব্যথা, ফোলাভাব বা অন্য কোনো সমস্যা হলে এই পরীক্ষা করা হয়।
গাইনোকোলজিক্যাল আলট্রাসনোগ্রাফি (Gynecological Ultrasonography)
মহিলাদের প্রজনন অঙ্গ যেমন – জরায়ু, ডিম্বাশয় এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব পরীক্ষার জন্য এটি করা হয়। এটি তলপেটের (Transabdominal) উপর দিয়ে অথবা ট্রান্সভ্যাজাইনাল (Transvaginal) পদ্ধতির মাধ্যমে করা যেতে পারে। অনিয়মিত মাসিক, তলপেটে ব্যথা বা বন্ধ্যাত্বের কারণ নির্ণয়ে এই পরীক্ষা সাহায্য করে।
অবস্টেট্রিক আলট্রাসনোগ্রাফি (Obstetric Ultrasonography)
গর্ভাবস্থায় বাচ্চার অবস্থা জানার জন্য এই পরীক্ষা করা হয়। বাচ্চার বৃদ্ধি, অবস্থান এবং কোনো জন্মগত ত্রুটি আছে কিনা, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়।
কার্ডিয়াক আলট্রাসনোগ্রাফি বা ইকোকার্ডিওগ্রাম (Cardiac Ultrasonography or Echocardiogram)
এই পরীক্ষায় হৃদপিণ্ডের গঠন এবং কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। হার্টের ভাল্ভ এবং চেম্বারের আকার দেখা হয়। শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথার কারণ নির্ণয়ে এটি সাহায্য করে।
ভাস্কুলার আলট্রাসনোগ্রাফি (Vascular Ultrasonography)
রক্তনালীগুলোর অবস্থা জানার জন্য এই পরীক্ষা করা হয়। রক্তনালীতে কোনো ব্লকেজ আছে কিনা, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায়। সাধারণত হাত-পায়ের রক্তনালী পরীক্ষার জন্য এটা করা হয়।
মাস্কুলোস্কেলেটাল আলট্রাসনোগ্রাফি (Musculoskeletal Ultrasonography)
এই পরীক্ষায় মাংসপেশি, লিগামেন্ট এবং জয়েন্টগুলো পরীক্ষা করা হয়। খেলাধুলা বা অন্য কোনো কারণে আঘাত পেলে এই পরীক্ষা করা হয়।
থাইরয়েড আলট্রাসনোগ্রাফি (Thyroid Ultrasonography)
থাইরয়েড গ্রন্থির আকার এবং গঠন দেখার জন্য এই পরীক্ষা করা হয়। থাইরয়েড নডিউল বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কিনা, তা জানতে এটি করা হয়।
USG পরীক্ষার আগে কী প্রস্তুতি নিতে হয়?
USG পরীক্ষার আগে কিছু প্রস্তুতি নিতে হয়, যা পরীক্ষার ধরনের ওপর নির্ভর করে। নিচে কয়েকটি সাধারণ প্রস্তুতি উল্লেখ করা হলো:
- পেটের আলট্রাসনোগ্রাফি: পরীক্ষার আগে সাধারণত ৬-৮ ঘণ্টা কিছু না খেয়ে থাকতে বলা হয়, যাতে পেটের ভেতরের অঙ্গগুলো পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।
- তলপেটের আলট্রাসনোগ্রাফি: এই পরীক্ষার আগে মূত্রাশয় (Urinary Bladder) ভর্তি রাখা জরুরি, তাই পরীক্ষা শুরুর আগে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে বলা হয়।
- অন্যান্য আলট্রাসনোগ্রাফি: কিছু পরীক্ষার জন্য বিশেষ কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না। তবে, পরীক্ষার আগে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারেন।
USG পরীক্ষা কীভাবে করা হয়?
USG পরীক্ষা সাধারণত একটি বিশেষ ঘরে করা হয়, যেখানে আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন থাকে। পরীক্ষার সময় রোগীকে একটি টেবিলের ওপর শুতে বলা হয়। একজন রেডিওলজিস্ট বাSonographer রোগীর শরীরের যে অংশের পরীক্ষা করা হবে, সেখানে একটি জেল লাগান। এরপর, তিনি একটি প্রোব (Transducer) ব্যবহার করে শরীরের সেই অংশে আলতোভাবে চাপ দেন এবং মেশিনের মাধ্যমে ছবি দেখতে থাকেন। প্রোব থেকে আসা শব্দ তরঙ্গ শরীরের ভেতরের অঙ্গ থেকে প্রতিফলিত হয়ে মেশিনে ফিরে আসে, যা থেকে ছবি তৈরি হয়।
USG পরীক্ষার সুবিধা কী কী?
USG পরীক্ষার অনেক সুবিধা রয়েছে। নিচে কয়েকটি প্রধান সুবিধা উল্লেখ করা হলো:
- নিরাপদ: USG পরীক্ষায় কোনো রেডিয়েশন ব্যবহার করা হয় না, তাই এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
- ব্যথামুক্ত: এই পরীক্ষা করার সময় কোনো ব্যথা লাগে না।
- দ্রুত: USG পরীক্ষা খুব দ্রুত করা যায় এবং এর ফলাফলও দ্রুত পাওয়া যায়।
- বহুমুখী: শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ছবি তোলার জন্য USG ব্যবহার করা যায়।
- সাশ্রয়ী: অন্যান্য ইমেজিং পদ্ধতির তুলনায় USG বেশ সাশ্রয়ী।
USG পরীক্ষার অসুবিধা কী কী?
USG পরীক্ষার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। নিচে কয়েকটি অসুবিধা উল্লেখ করা হলো:
- অস্পষ্ট ছবি: কিছু ক্ষেত্রে, USG ছবিতে ভেতরের অঙ্গগুলোর ছবি পরিষ্কারভাবে নাও দেখা যেতে পারে, বিশেষ করে যদি রোগীর শরীরে অতিরিক্ত মেদ থাকে।
- হাড়ের বাধা: হাড়ের কারণে শব্দ তরঙ্গ বাধা পেতে পারে, তাই হাড়ের ভেতরের অঙ্গগুলোর ছবি তোলা কঠিন হতে পারে।
- গ্যাসের সমস্যা: পেটে অতিরিক্ত গ্যাস থাকলে USG ছবি অস্পষ্ট হতে পারে।
USG পরীক্ষার ফলাফল
USG পরীক্ষার পর রেডিওলজিস্ট ছবিগুলো ভালোভাবে দেখে একটি রিপোর্ট তৈরি করেন। এই রিপোর্টে পরীক্ষার ফলাফল এবং কোনো অস্বাভাবিকতা থাকলে তা উল্লেখ করা হয়। এরপর রিপোর্টটি রোগীকে দেওয়া হয়, যা দেখে ডাক্তার রোগীর অবস্থা বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারেন।
USG পরীক্ষার খরচ কেমন?
USG পরীক্ষার খরচ বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত, এটি ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কিছু বিশেষ পরীক্ষার জন্য খরচ আরও বেশি হতে পারে।
এখানে একটি টেবিল দেওয়া হলো, যেখানে বিভিন্ন USG পরীক্ষার আনুমানিক খরচ উল্লেখ করা হয়েছে:
| পরীক্ষার নাম | আনুমানিক খরচ (টাকা) |
|---|---|
| পেটের আলট্রাসনোগ্রাফি | ৮০০ – ২০০০ |
| গাইনোকোলজিক্যাল আলট্রাসনোগ্রাফি | ১০০০ – ২৫০০ |
| অবস্টেট্রিক আলট্রাসনোগ্রাফি | ১০০০ – ৩০০০ |
| থাইরয়েড আলট্রাসনোগ্রাফি | ৭০০ – ২০০০ |
| ইকোকার্ডিওগ্রাম | ১৫০০ – ৫০০০ |
USG এবং এক্স-রে এর মধ্যে পার্থক্য কী?
USG এবং এক্স-রে দুটোই ইমেজিং পদ্ধতি, তবে এদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নিচে এই পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | USG (আলট্রাসনোগ্রাফি) | এক্স-রে |
|---|---|---|
| রেডিয়েশন ব্যবহার | ব্যবহার করা হয় না | ব্যবহার করা হয় |
| ছবি তৈরির প্রক্রিয়া | শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে | রেডিয়েশন ব্যবহার করে |
| সুবিধা | নিরাপদ, ব্যথামুক্ত, দ্রুত এবং সাশ্রয়ী | হাড়ের ছবি তোলার জন্য ভালো |
| অসুবিধা | ছবি অস্পষ্ট হতে পারে, গ্যাসের কারণে বাধা আসতে পারে | রেডিয়েশনের ঝুঁকি আছে, নরম টিস্যুর জন্য ভালো নয় |
USG করার সময় কি কোনো ঝুঁকি থাকে?
USG করার সময় সাধারণত কোনো ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে। যেহেতু এই পরীক্ষায় রেডিয়েশন ব্যবহার করা হয় না, তাই এটি গর্ভবতী মহিলাদের জন্যেও নিরাপদ। তবে, কিছু ক্ষেত্রে, যেমন ট্রান্সভ্যাজাইনাল USG-এর সময় সামান্য অস্বস্তি হতে পারে, কিন্তু সেটিও তেমন গুরুতর নয়।
বারবার USG করানো কি ক্ষতিকর?
যেহেতু USG পরীক্ষায় রেডিয়েশন ব্যবহার করা হয় না, তাই এটি বারবার করালেও কোনো ক্ষতিকর প্রভাব নেই। গর্ভাবস্থায় অনেক মহিলাকে একাধিকবার USG করাতে হয় বাচ্চার সঠিক অবস্থা জানার জন্য, এবং এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
USG রিপোর্টে কি সব রোগ ধরা পরে?
USG রিপোর্টে অনেক রোগ ধরা পড়লেও, এটি সব রোগের জন্য উপযুক্ত নয়। কিছু রোগ, যেমন হাড়ের ভেতরের সমস্যা বা খুব ছোট টিউমার, USG-তে নাও ধরা পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে, ডাক্তার অন্যান্য পরীক্ষা যেমন এমআরআই (MRI) বা সিটি স্ক্যান (CT Scan) করার পরামর্শ দিতে পারেন।
আলট্রাসনোগ্রাফি কি ক্যান্সার নির্ণয় করতে পারে?
আলট্রাসনোগ্রাফি ক্যান্সার নির্ণয়ের একটি সহায়ক পদ্ধতি হতে পারে, তবে এটি সম্পূর্ণরূপে ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। USG-এর মাধ্যমে টিউমার বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা সনাক্ত করা যায়, কিন্তু সেটি ক্যান্সার কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য বায়োপসি (Biopsy) করার প্রয়োজন হতে পারে।
USG রিপোর্টে সিস্ট মানে কি?
USG রিপোর্টে সিস্ট (Cyst) মানে হলো শরীরের কোনো অংশে তরল পদার্থ ভর্তি একটি থলি বা গহ্বর। সিস্ট সাধারণত ক্ষতিকর নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ব্যথা বা অস্বস্তির কারণ হতে পারে। সিস্টের আকার এবং অবস্থানের ওপর নির্ভর করে ডাক্তার এর চিকিৎসা নির্ধারণ করেন।
শেষ কথা
USG পরীক্ষা আমাদের শরীরের ভেতরের অবস্থা জানার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং নিরাপদ উপায়। এই পরীক্ষা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে আপনি সহজেই যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে পারবেন।
আশা করি, আজকের ব্লগ পোস্টটি আপনাদের ভালো লেগেছে এবং USG পরীক্ষা সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য জানতে পেরেছেন। কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন!
